বালুরঘাট : কথায় বলে, ‘যা নেই মহাভারতে, তা নেই ভারতে।’ সেই মহাভারতের বিশাল আখ্যানের অসংখ্য চরিত্রের ভিড়ে বিকর্ণ যেন খানিকটা বিস্মৃত নাম। অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস দেখিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের এই পুত্র। সেই বিকর্ণকেই কেন্দ্র করে বালুরঘাটের শতাব্দীপ্রাচীন নাট্যদল নাট্যমন্দির মঞ্চস্থ করল ‘মহাভারতের এক অজানা আখ্যান—বিকর্ণ’।রবিবার সন্ধ্যায় নাট্যমন্দির সভাগৃহে মঞ্চস্থ এই প্রযোজনা মূলত এক ব্যক্তির বিবেকের সঙ্গে রাজশক্তি ও পারিবারিক আনুগত্যের দ্বন্দ্বের আখ্যান। রুদ্রেন্দুশেখর জানা-র লেখা নাটকটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ইন্দ্রনীল দাস। আলোয় পাপাই রবিদাস।দ্যুতক্রীড়ার সভায় দ্রৌপদীর অপমানের সময় কৌরবদের মধ্যেই দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন বিকর্ণ। নাটকটি সেই প্রতিবাদের পরবর্তী মানসিক অভিঘাতকে সামনে আনে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার পর নিজের ঘরে ফিরে বিকর্ণের অনুতাপ, আত্মজিজ্ঞাসা এবং ভেতরের টানাপড়েন নাটকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরে ভীষ্ম ও দ্রোণাচার্যের তাঁর বাড়িতে এসে বিকর্ণের সাহসের প্রশংসা করা এবং নিজেরা কেন সেই সময় একই ভাবে প্রতিবাদ করতে পারেননি, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দৃশ্য নাটকটির ভাবনাকে আরও গভীর করেছে।সূত্রধারের ভূমিকায় সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকর্ণের চরিত্রে জয়দীপ মণ্ডল, অর্কপ্রিয়া কুণ্ডু, দেবজিৎ রায় এবং দ্রোণাচার্যের ভূমিকায় ইন্দ্রনীল দাস অভিনয় করেছেন। সঙ্গে ছিলেন অপূর্ব চক্রবর্তী ও সুব্রত নট্ট।অভিনয়ে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছেন দেবজিৎ রায়। অর্কপ্রিয়া কুণ্ডু ও সুচেতনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ও প্রশংসনীয়। ইন্দ্রনীল দাসের অভিনয়ে ছিল প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা। অল্প সময়ের উপস্থিতিতেও অপূর্ব চক্রবর্তী ও সুব্রত নট্ট নিজেদের ছাপ রেখেছেন। তবে প্রধান চরিত্রে জয়দীপ মণ্ডলের অভিনয়ে মাঝে মাঝে অতিনাটকীয়তা চোখে পড়েছে। বিকর্ণের মতো সংযত অথচ গভীর চরিত্রে আরও ভারসাম্য থাকলে অভিনয়টি আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠত।কিছু খামতি থাকলেও, পরিচিত মহাভারতের আখ্যান থেকে বিকর্ণের মতো একটি চরিত্রকে নতুন দৃষ্টিতে দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মূল্য এবং নীরব থাকার দায়, দুই প্রশ্নই মঞ্চে রেখে গেল নাট্যমন্দিরের এই প্রযোজনা।