নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট: ‘ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’। নিজের সম্পর্কে এমনই বলতেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটক। তাঁর সেই ভাঙাচোরা অথচ আপসহীন শিল্পীসত্তা, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের গল্পই এ বার মঞ্চে তুলে আনল বালুরঘাটের নাট্যদল নাট্যতীর্থ। ‘অনুঘটক’ নামের এই প্রযোজনায় ফিরে এল বাংলা গণনাট্য আন্দোলনের উত্তাল দিন, শিল্পীর সঙ্গে রাজনীতির সংঘাত এবং এক ব্যতিক্রমী প্রতিভার জীবনসংগ্রাম। প্রথম প্রদর্শনেই নাটকটি ঘিরে দর্শকদের প্রশংসা নতুন করে আলোচনায় এনেছে বালুরঘাটের নাট্যচর্চাকে।
ঋত্বিক ঘটকের শৈশব থেকে শুরু করে তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যোগ এবং জীবনের শেষ পর্ব পর্যন্ত নানা অধ্যায় নাটকের মধ্যে দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন নির্দেশক শুভাশিস চক্রবর্তী। শুধু এক কিংবদন্তির জীবনী নয়, সেই সময়ের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক টানাপড়েনও জায়গা পেয়েছে নাটকে। গণনাট্য আন্দোলনের শুরুর দিনগুলির পাশাপাশি সংগঠনের সঙ্গে ঋত্বিকের সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কারণে তাঁকে সংগঠনের বাইরে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্তের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে মঞ্চে।
নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা, আবহ নির্মাণ ও নির্দেশনা, সব দিকই সামলেছেন শুভাশিস। আলোয় পাপাই রবিদাস। সংগীত ও আবহ তৈরিতে শুভাশিসকে সহযোগিতা করেছেন সৌরভ নন্দী, সন্দীপ, শুভম-সহ অন্যরা। ঋত্বিকের ব্যক্তিগত টানাপড়েনের সঙ্গে সমকালীন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিকে মেলানোর চেষ্টাই এই প্রযোজনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অভিনয়ে শৈশবের ঋত্বিকের চরিত্রে প্রতাপ বিশ্বাস নজর কেড়েছেন। মধ্যবয়সের ঋত্বিকের ভূমিকায় সুমন ভৌমিকও দর্শকদের মনে ছাপ ফেলেছেন। নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের চরিত্রে জগন্নাথ দত্তের অভিনয় আলাদা করে প্রশংসা পেয়েছে। দীপায়ন লস্কর, তন্তু দাস, শ্রেয়া সাহা-সহ অন্য শিল্পীরাও নিজেদের চরিত্রে স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন।
তবে নাটকের অন্যতম আকর্ষণ ঋত্বিকের পরিণত বয়সের চরিত্রে মনোজ গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় সোমদত্তা চক্রবর্তী। বালুরঘাটের নাট্যমঞ্চের দীর্ঘদিনের পরিচিত এই দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁদের অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নতুন করে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ঋত্বিকের জীবনসংগ্রাম, মানসিক টানাপড়েন ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তাঁদের অভিনয়ে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।
প্রথম প্রদর্শনী দেখেই অনেক দর্শকের প্রত্যাশা, আরও দু’-তিনটি মঞ্চায়নের পরে ‘অনুঘটক’ কলকাতার প্রতিষ্ঠিত নাট্যদলগুলির প্রযোজনার সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারবে।
নাটকটি দেখতে বিশেষ ভাবে মালদা থেকে বালুরঘাটে এসেছিলেন গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা ক্লাবের পরিচালক সমীপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “শুধু মালদা থেকে এই নাটকটি দেখতে এসেছি। ‘অনুঘটক’ ঋত্বিক ঘটকের জীবনের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। তাই নাটকটির প্রতি আলাদা আকর্ষণ ছিল। নাটকটি দেখে খুব ভাল লাগল।”
ঋত্বিক ঘটকের জীবনকে কেন্দ্র করে ‘অনুঘটক’ আসলে শিল্প, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সংঘাতের এক মঞ্চভাষ্য। আর সেই ভাষ্যের মধ্য দিয়েই বালুরঘাটের নাট্যতীর্থ মনে করিয়ে দিল, নাটকের শহর হিসেবে এই শহরের ঐতিহ্য আজও কতটা জীবন্ত।