নিজস্ব সংবাদদাতা, ১১ ফেব্রুয়ারি,বালুরঘাট :- চোখে আলো নেই তাঁর। তবু ভোর হলেই হাতড়ে খুঁজে নেন নাতির হাতটা। তারপর দু’জনে বেরিয়ে পড়েন পথে। একজন জন্মান্ধ বৃদ্ধা, অন্যজন কিশোর—যার থাকার কথা স্কুলের বেঞ্চে। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট ব্লকের ভাটপাড়া পঞ্চায়েতের চকশ্যাম সংসদের নয়াপাড়া গ্রামে এভাবেই দিন কাটছে ৫৫ বছরের মুনি হাসদা ও তাঁর ১৪ বছরের নাতি বিজয় মার্ডির। সরকারি নথিতে মুনি ‘শতভাগ প্রতিবন্ধী’। মাসে পান এক হাজার টাকা ভাতা। বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সেই টাকা ফুরোতে সময় লাগে না। বাকি দিনগুলোতে ভরসা ভিক্ষা। না বেরোলে খাওয়া জোটে না, শান্ত গলায় বলেন মুনি। সংসারে আর কেউ কার্যত নেই। একমাত্র ছেলে ভবঘুরে। বাবা-মা হারানো বিজয়ই এখন তাঁর ছায়া। আবার বিজয়ের কাছেও ঠাকুমাই সব। সকাল থেকে দুপুর—গ্রাম পেরিয়ে বাজার, কখনও বাসস্ট্যান্ড—যেখানে দু’একজন সহানুভূতিশীল মানুষ দু’টাকা, পাঁচ টাকা দেন, সেখানেই দাঁড়ায় তারা। পড়াশোনার কথা উঠতেই মুখ নীচু করে বিজয়। ভিক্ষে না করলে খেতে পাই না। তাই স্কুলে যাওয়া হয়নি, বলে সে। তার সমবয়সিরা যখন বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায়, তখন সে ঠাকুমার হাত শক্ত করে ধরে রাস্তা চেনে।ভাঙা কুঁড়েঘরই তাদের আশ্রয়। মাটির উনুনে হাতড়ে হাতড়ে রান্না করেন মুনি। চোখে আলো না থাকলেও নাতির থালা ঠিকই সাজিয়ে দেন। একবেলা খাই, একবেলা না খেয়েই থাকি, বলেন তিনি। অভিযোগের সুর নেই, আছে শুধু ক্লান্তি।প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, আদিবাসী অধ্যুষিত এই পাড়ায় অধিকাংশই দরিদ্র। আমরাও কষ্টে আছি। সাহায্য করার মতো ক্ষমতা নেই,বলেন প্রতিবেশী হেমন্তি টুডু। বালুরঘাট পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি অরূপ সরকার বলেন, সরকারি নানা প্রকল্প রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু নয়াপাড়ার কুঁড়েঘরে সেই আশ্বাস এখনও পৌঁছয়নি। সেখানে প্রতিদিনই একই ছবি—অন্ধ ঠাকুমার হাত ধরে কিশোরের পথচলা। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়, ভিক্ষার ঝুলিতেই কি আটকে থাকবে বিজয়ের শৈশব? নাকি কোনও একদিন সত্যিই আলো জ্বলবে সেই ঘরে?